পবিত্র হজ ২০২৬ শুরু: মিনায় লাখো হাজীর লাব্বাইক ধ্বনি, আরাফাতের ময়দানে যাওয়ার প্রস্তুতি
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 25 May, 2026
মিনা, সৌদি আরব: পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। লাখো কণ্ঠের "লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক" (আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির) ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে মিনার তাঁবু নগরী।
জিলহজ মাসের ৮ তারিখ, সোমবার (২৫ মে, ২০২৬) ‘ইয়াওমুত তারবিয়াহ’ বা তারবিয়াহর দিন উদযাপনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই ধর্মীয় মহাসমাবেশের সূচনা ঘটে।
এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৫ লক্ষাধিক বিদেশি এবং কয়েক লাখ অভ্যন্তরীণ পুণ্যার্থীসহ প্রায় ২০ লাখ মুসলমান হজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে সমবেত হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকেও এ বছর প্রায় ৭৮,৫০০ জন হাজী এই পবিত্র দায়িত্ব পালনে অংশ নিয়েছেন।
মিনার তাঁবু নগরীতে অবস্থানের মধ্য দিয়ে হজের সূচনা
পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত পাহাড়বেষ্টিত মিনা উপত্যকা। রবিবার রাত থেকেই ইহরাম পরিহিত হাজীরা পায়ে হেঁটে কিংবা গাড়িতে করে মিনায় আসতে শুরু করেন। সোমবার সারাদিন ও রাত তাঁরা মিনায় অবস্থান করে মহান আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকেন।
হজের নিয়ম অনুযায়ী, হাজীরা মিনায় জোহরের নামাজ থেকে শুরু করে আসর, মাগরিব, এশা এবং পরদিন (মঙ্গলবার) ফজরের নামাজ আদায় করবেন। এখানে চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজগুলোকে কসর (সংক্ষিপ্ত বা দুই রাকাত) করে আদায় করা সুন্নত।
হজের মূল স্তম্ভ: আরাফাতের ময়দানে যাত্রা
মঙ্গলবার (৯ জিলহজ) সূর্যোদয়ের পর হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল রোকন "উকুফে আরাফা" বা আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের জন্য হাজীরা মিনা থেকে রওনা হবেন।
আরাফাতের খুতবা: মঙ্গলবার দুপুরে আরাফাতের ময়দানে হজের মূল খুতবা প্রদান করা হবে। এ বছর পবিত্র হজের খুতবা দেবেন মসজিদে নববীর প্রধান ইমাম ও খতিব শেখ আলী বিন আবদুল রহমান আল-হুজাইফী।
মুজদালিফায় রাত যাপন: আরাফাতের ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করে হাজীরা মাগরিবের নামাজ না পড়েই মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। সেখানে গিয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ একসাথে আদায় করবেন এবং খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করবেন। পাশাপাশি জামারায় (শয়তানকে) নিক্ষেপ করার জন্য পাথর সংগ্রহ করবেন।
তীব্র গরম ও আবহাওয়া সতর্কতা: তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে
চলতি বছর হজ মৌসুমে তীব্র গরমের মুখোমুখি হতে হচ্ছে হাজীদের। সৌদি আরবের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র (NCM) জানিয়েছে, তারবিয়াহর দিনে মিনার তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আবহাওয়া অধিদপ্তর মিনা অবজারভেটরির মাধ্যমে প্রতি ঘণ্টায় বুলেটিন প্রকাশ করছে। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাজীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে:
* বেলা ১১টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত সরাসরি সূর্যালোকে দীর্ঘ পথ হাঁটা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
* হিট স্ট্রোক ও পানিশূন্যতা এড়াতে পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ এবং সার্বক্ষণিক ছাতা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
* হাজীদের সুবিধার্থে মিনার তাঁবুগুলোতে উন্নত কুলিং সিস্টেম এবং রাস্তায় কৃত্রিম পানির ফোয়ারার (মিস্ট ফ্যান) ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় সৌদি প্রশাসন
সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাজীদের যাতায়াত, আবাসন ও নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। জিলকদ মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আবাসন, পরিবহন ও ক্যাটারিং সুবিধাসমূহ যাচাই করতে ৮৩,০০০ এরও বেশি ফিল্ড পরিদর্শন করা হয়েছে।
হাজীদের দ্রুত ও নিরাপদ যাতায়াতের জন্য 'আল-মাশায়ের মেট্রো' (Mashair Train) তার প্রথম যাত্রা শুরু করেছে, যা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৭২,০০০ যাত্রী পরিবহনে সক্ষম। এছাড়া যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য চিকিৎসকদের পাশাপাশি ড্রোনের মাধ্যমেও নজরদারি ও জরুরি ওষুধ সরবরাহের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও হাজীদের আবেগ
বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও হজের আধ্যাত্মিক আবহে কোনো কমতি দেখা যায়নি। বিভিন্ন দেশের সরকারি ভ্রমণ সতর্কতা উপেক্ষা করেই হাজীরা মক্কায় ছুটে এসেছেন।
আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশ করে হাজীরা জানিয়েছেন, হজের এই পবিত্র ভূমিতে এসে তারা নিজেদের পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থানে অনুভব করছেন এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও ঐক্য কামনায় প্রার্থনা করছেন।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

